“স্মৃতির ভেতর তুমি”

Online track bangla help24

 “স্মৃতির ভেতর তুমি”

নীল আকাশের নিচে নদীর পাড়টা আজ অদ্ভুত শান্ত। সন্ধ্যার হালকা বাতাসে কাশফুলগুলো দুলছে, যেন কারও অজানা অপেক্ষার কথা বলছে। সেই নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব—চোখে একরাশ অস্থিরতা, মনে হাজার প্রশ্ন।

মেহরাব কখনোই খুব বেশি কথা বলত না। ছোটবেলা থেকেই সে একটু অন্যরকম—চুপচাপ, নিজের জগতে থাকা এক ছেলে। কিন্তু তার জীবনে একসময় এমন একজন আসে, যে তার নিঃশব্দ পৃথিবীটাকে রঙিন করে তোলে।

তার নাম ছিল আরিবা।


প্রথম দেখা হয়েছিল কলেজের লাইব্রেরিতে। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। জানালার কাঁচে টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ, আর বইয়ের পাতার গন্ধ—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত পরিবেশ। মেহরাব তখন ইতিহাসের একটা বই খুঁজছিল, কিন্তু হঠাৎ করেই পাশের তাক থেকে একটা বই পড়ে যায়।

“ওহ! সরি!”—মিষ্টি কণ্ঠে বলে উঠেছিল মেয়েটা।

মেহরাব তাকিয়ে দেখেছিল—একটা সাদা সালোয়ার কামিজ পরা মেয়ে, চোখে চশমা, চুলগুলো একটু এলোমেলো। কিন্তু তার হাসিটা ছিল একদম আলাদা।

“না, সমস্যা নেই,” মেহরাব ছোট করে বলেছিল।

“তুমি কি এই বইটা খুঁজছিলে?”—আরিবা বইটা তুলে ধরে জিজ্ঞেস করেছিল।

সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি। কিন্তু মেহরাব বুঝতে পারেনি কেন সে বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিল।


দিন যেতে থাকে। অজান্তেই তাদের দেখা হওয়া শুরু হয়—কখনো ক্যান্টিনে, কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো করিডোরে। আরিবার একটা অভ্যাস ছিল—সে সবসময় গল্প করত, আর মেহরাব শুনত।

“তুমি এত চুপচাপ কেন?”—একদিন জিজ্ঞেস করেছিল আরিবা।

“আমি এমনই,”—মেহরাব উত্তর দিয়েছিল।

“তাহলে আজ থেকে তুমি আমার সাথে কথা বলবে বেশি। আমি তোমাকে বদলে দেব,”—হেসে বলেছিল আরিবা।

সেই হাসিটাই ধীরে ধীরে মেহরাবের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হয়ে ওঠে।


একদিন বিকেলে তারা নদীর পাড়ে বসেছিল। আকাশে সূর্য ডুবছে, চারপাশে লালচে আলো।

“তুমি কখনো কাউকে ভালোবেসেছ?”—হঠাৎ করে প্রশ্ন করল আরিবা।

মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল, “না।”

“আমি কিন্তু বিশ্বাস করি না,”—হেসে বলল আরিবা।

“কেন?”

“কারণ তোমার চোখে একটা গল্প আছে। যে গল্প কেউ না কেউ শুরু করেছে।”

মেহরাব কিছু বলল না। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল—এই মেয়েটাই হয়তো সেই গল্পের শুরু।


সময় গড়াতে থাকে। তাদের বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে অন্যরকম কিছুতে রূপ নিতে থাকে। তারা একে অপরকে না দেখলে অস্থির হয়ে উঠত। ফোনে কথা না বললে দিনটাই অসম্পূর্ণ লাগত।

একদিন রাতে মেহরাব সাহস করে একটা মেসেজ পাঠাল—

“আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।”

কিছুক্ষণ পর রিপ্লাই এল—“বল।”

মেহরাব অনেকক্ষণ ধরে টাইপ করছিল, আবার ডিলিট করছিল। অবশেষে লিখল—

“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”

সেন্ড করার পর তার হাত কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল—সবকিছু হয়তো বদলে যাবে।

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর এল না।

তারপর একটা মেসেজ—

“আমি জানতাম।”

মেহরাব অবাক হয়ে গেল। আবার রিপ্লাই এল—

“কারণ আমিও তোমাকে ভালোবাসি।”


সেই মুহূর্তটা ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়।

তাদের দিনগুলো হয়ে উঠল আরও রঙিন। তারা একসাথে ঘুরতে যেত, নদীর পাড়ে বসে গল্প করত, ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখত।

“আমরা একদিন একটা ছোট্ট বাড়ি বানাবো,”—বলেছিল আরিবা।

“হ্যাঁ, আর সেখানে একটা বড় লাইব্রেরি থাকবে,”—যোগ করেছিল মেহরাব।

“আর একটা বারান্দা, যেখানে বসে আমরা বৃষ্টি দেখব,”—হেসে বলেছিল আরিবা।

সবকিছু যেন একদম নিখুঁত ছিল।


কিন্তু জীবনের গল্প সবসময় সহজ হয় না।

একদিন হঠাৎ করেই আরিবা দূরে সরে যেতে শুরু করল। তার ফোন কম আসতে লাগল, মেসেজের উত্তর দিতে দেরি করত।

মেহরাব বুঝতে পারছিল কিছু একটা ভুল হচ্ছে।

“কি হয়েছে?”—একদিন জিজ্ঞেস করল সে।

“কিছু না,”—সংক্ষিপ্ত উত্তর।

“তুমি বদলে গেছ,”—বলল মেহরাব।

আরিবা কিছু বলল না। শুধু চুপ করে থাকল।


কয়েকদিন পর আরিবা দেখা করতে বলল।

নদীর পাড়েই তারা আবার দাঁড়িয়ে।

কিন্তু আজকের পরিবেশটা অন্যরকম—অস্থির, ভারী।

“আমাকে বিয়ে দিতে চায় বাড়িতে,”—ধীরে ধীরে বলল আরিবা।

মেহরাবের মনে হল তার চারপাশের সবকিছু থেমে গেছে।

“তুমি কি বলেছ?”—কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে।

“আমি না বলতে পারিনি,”—চোখে পানি নিয়ে বলল আরিবা।

“কেন?”—মেহরাবের কণ্ঠে হতাশা।

“কারণ আমি আমার পরিবারের বিরুদ্ধে যেতে পারব না।”


সেই মুহূর্তটা ছিল তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

“তাহলে আমাদের কি হবে?”—জিজ্ঞেস করল মেহরাব।

আরিবা চুপ করে রইল। তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

“সবকিছু কি এখানেই শেষ?”—মেহরাব আবার বলল।

“হয়তো…”—ফিসফিস করে বলল আরিবা।


তারপরের দিনগুলো ছিল অন্ধকার।

মেহরাব নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তার চারপাশে সবকিছু আগের মতো থাকলেও, তার ভেতরের জগৎটা ভেঙে পড়ে।

সে প্রতিদিন নদীর পাড়ে আসে—যেখানে তাদের স্মৃতি লুকিয়ে আছে।

কখনো সে ভাবে—সবকিছু যদি আবার ঠিক হয়ে যেত।

কখনো সে ভাবে—ভালোবাসা কি সত্যিই এত দুর্বল?


একদিন হঠাৎ করে সে একটা চিঠি পায়।

চিঠিটা আরিবার।

“মেহরাব,

আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি কখনো তোমাকে ভুলতে পারিনি।

আমি চেষ্টা করেছি—নিজেকে বোঝাতে, সবকিছু মেনে নিতে। কিন্তু পারিনি।

তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ।

হয়তো আমরা একসাথে থাকতে পারিনি, কিন্তু আমার ভালোবাসা কখনো বদলাবে না।

যদি কোনোদিন আবার দেখা হয়, আমি চাই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।

– আরিবা”


চিঠিটা পড়ে মেহরাব অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল।

তার চোখে পানি ছিল, কিন্তু মনে একটা অদ্ভুত শান্তি।

সে বুঝতে পারল—সব ভালোবাসার শেষ একসাথে হওয়া নয়।

কিছু ভালোবাসা শুধু স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।


বছর কেটে যায়।

একদিন আবার সেই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকে মেহরাব।

আকাশটা আগের মতোই নীল, কাশফুলগুলো আগের মতোই দুলছে।

কিন্তু আজ তার মনে আর কোনো অস্থিরতা নেই।

কারণ সে জানে—

ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না।

এটা শুধু রূপ বদলায়।

আর কিছু গল্প—অসম্পূর্ণ হয়েও সবচেয়ে সুন্দর হয়ে থাকে।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default