টেক্সাসে রওনা দেওয়ার আগে হোয়াইট হাউসের লন থেকে ‘মেরিন ওয়ান’ হেলিকপ্টারে ওঠার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, ৭ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স এক মাসের কম সময়ের মধ্যে গত বুধবার তৃতীয়বারের মতো টেক্সাস সফর করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি ডেমোক্র্যাটদের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসন নিয়ে সতর্কবার্তা দেন। ট্রাম্প এবার এমন এক সিনেট প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামলেন, যিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং খোদ প্রেসিডেন্টও অতীতে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে নানা ভাষায় অপমান করেছিলেন।
আসন্ন ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের শেষ মুহূর্তের জোর প্রস্তুতি চলছে। সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে ট্রাম্পের ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। আর এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা টিকিয়ে রাখার মূল পথ এবার টেক্সাসের ওপর দিয়েই গেছে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার হিসাবের কেন্দ্রে রয়েছে এই টেক্সাস। ১৯৯৪ সালের পর থেকে টেক্সাসে রাজ্য স্তরের কোনো নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেননি। এমনকি ২০২৪ সালের নির্বাচনেও এই অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প ১৩ পয়েন্টের বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। তবে এবার ভোটের সমীকরণ কিছুটা ভিন্ন।
জনমত জরিপগুলো বলছে, রিপাবলিকান প্রার্থী ও অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর ধারণার চেয়েও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্যাক্সটনের অবস্থান শক্তিশালী করতে লাখ লাখ ডলার ঢালছেন রিপাবলিকানরা।
সান আন্তোনিওতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি ছিল তাঁর চিরচেনা চটজলদি স্বভাবের, যেখানে রসাত্মক মুহূর্তের পাশাপাশি বিরোধীদের ওপর ছিল তীব্র আক্রমণ। নিজের পাতলা হয়ে যাওয়া চুল নিয়ে কৌতুক করার পাশাপাশি তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী তালারিকোকে মিথ্যাই ‘ভেগান’ (নিরামিষভোজী) বলে আক্রমণ করেন। সেই সঙ্গে ট্রাম্প উল্লেখ করেন, সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন যে তিনি এ শব্দের উচ্চারণ ভুল করছিলেন। সমাবেশ চলাকালে অন্তত এক ডজন বিক্ষোভকারী কয়েক দফায় ট্রাম্পের বক্তব্যে বাধা সৃষ্টি করলে তাঁদের অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ইরান চাইলে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগো ‘ধ্বংস করে দিতে’ পারে—ট্রাম্পের এমন এক মন্তব্যে উভয় দলের নেতাদের মধ্যেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছিল। সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প সেই উসকানিমূলক বক্তব্যের কিছুটা স্পষ্টীকরণ করার চেষ্টা করেন। এবার একই ধরনের মন্তব্যের পাশাপাশি তিনি বলেন, ‘আমরা এমনটা হতে দেব না।’
এ সমাবেশের কার্যকারিতা আগামী দিনগুলোয় বেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে জানান টেক্সাসের এক রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ। তাঁর মতে, এ আয়োজন প্যাক্সটনের জনপ্রিয়তার গ্রাফ কতটা বৃদ্ধি করতে পারল, তার ওপরই নির্ভর করছে এই অঙ্গরাজ্যে দলটির ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত।
এক সপ্তাহের কম সময়ের ব্যবধানে টেক্সাসে এটি প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় সফর। মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্পের দেশব্যাপী যে ঝটিকা নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে, তারই অংশ এটি। দুই বছর আগে যেসব ঐতিহ্যবাহী ‘লাল দুর্গ’ তথা রিপাবলিকান ঘাঁটিতে ট্রাম্প বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সেসব অঙ্গরাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। এর মধ্যে অ্যালাবামা, ওকলাহোমা ও নেব্রাস্কা অন্যতম। নির্বাচনী সমাবেশগুলোয় ট্রাম্প বারবার তাঁর সমর্থকদের বলছেন, তাঁরা যেন ধরে নেন এ নির্বাচনে ব্যালট পেপারে তাঁর নামও আছে। ট্রাম্পের উপদেষ্টাদেরও ধারণা, আগামী নভেম্বরের বৈতরণি পার হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো দলের নিজস্ব ভোটব্যাংককে পুরোপুরি মাঠে নামানো।
তবে এ কট্টর রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যগুলোয়ও দলের কিছু নেতা বর্তমানে জনপ্রিয়তাহীন এই প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। যেমন টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট সময়ের টানাটানির অজুহাত দেখিয়ে বুধবার সন্ধ্যার এ সমাবেশে উপস্থিত হননি। এমনকি গত সপ্তাহে ট্রাম্পের টেক্সাস সফরটিও তিনি এড়িয়ে গেছেন।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের সান আন্তোনিওতে কেন প্যাক্সটনের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় তাঁর বক্তব্য শুনছেন সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন ও সিনেটর টেড ক্রুজ। ৭ অক্টোবর ২০২৬ছবি: রয়টার্স এমন পরিস্থিতিতে টেক্সাসের সেই রিপাবলিকান নির্বাচনী কৌশলবিদ বলেন, ‘আমার কাছে এটি বেশ স্পষ্ট যে প্যাক্সটনের নির্বাচনী দল হিসাব–নিকাশ করেই মাঠে নেমেছে। তারা বিশ্বাস করে, ট্রাম্পকে পাশে পাওয়াটা তাদের জন্য পুরোপুরি লাভজনক।’
এদিকে নিজের নির্বাচনী লড়াইয়ে বিপাকে পড়ার জন্য প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর কিছু নীতিকে পরোক্ষভাবে দায়ী করে সংবাদ শিরোনামে এসেছেন কেন প্যাক্সটন। গত মাসে প্যাক্সটন দাতা ও লবিস্টদের এক সভায় বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্য তাঁর নির্বাচনী প্রচারকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের হাতে আসা এক অডিও রেকর্ডে তাঁকে এমন মন্তব্য করতে শোনা যায়। এক্সিওসের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্যাক্সটন সেখানে বলেন, ‘আমি তো এসব সিদ্ধান্ত নিই না, আর...এসব সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কী কারণ আছে, তা–ও আমি জানি না।’ তবে সিএনএন স্বাধীনভাবে এ অডিওর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। অবশ্য প্যাক্সটনের নির্বাচনী দল এ খবরকে উড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর মুখপাত্র ম্যাডিসন সার্সি সিএনএনকে এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল আসলে সে কথাই বলেছেন, যা প্রত্যেক টেক্সাসবাসী ইতিমধ্যে জানেন। পেট্রল ও ডিজেলের দাম বড্ড চড়া। খেটে খাওয়া টেক্সাসবাসীকে জ্বালানি স্টেশন আর মুদিদোকানে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ট্রাম্প দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনতে তাঁর সাধ্যমতো সবকিছুই করছেন।